Header Ads

Header ADS

কোটাবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিন: ছাত্রদের সংগ্রাম, সরকারের পতন ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

 

কোটাবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিন: ছাত্রদের সংগ্রাম, সরকারের পতন ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

 

প্রফেসর ড. মোঃ জাফর উল্লাহ, প্রাক্তন ডিন, কৃষি অনুষদ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা

( সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে লিখিত)

 

কোটা ব্যবস্থার বিবর্তন ও আন্দোলনের পটভূমি

১৯৭২ সালে চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য 80% কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির মুখে ১৯৭৬ সালে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য ৪০ % কোটা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে মেধাবহির্ভূত কোটা কমিয়ে ৬0% করা হয়। ১৯৯০ সালে মেধার ভিত্তিতে কোটা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে ১৯৯৬ সালে মেধা কোটা ৪০ % থেকে বাড়িয়ে ৫৫ % করা হয়। পরবর্তীতে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ২০১৮ সালে সরকার কোটা প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়।

হাইকোর্টের রায় থেকে সরকার পতনের আন্দোলন

২০২৪ সালের পাঁচ জুন, দুজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের রিটের ফলে হাইকোর্ট পূর্বের কোটা প্রথা পুনর্বহাল করলে ছাত্ররা আবার রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্রদের আন্দোলন সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার হাইকোর্টের আপিল বিভাগে জুন মাসের তারিখের আদেশ বাতিলের আবেদন করে। আপিল বিভাগ ১১ জুলাই ৯১% মেধা কোটার পক্ষে একটি রায় প্রদান করে। তবে আন্দোলনকারীদের উপর সরকারের দমন-পীড়ন, গণগ্রেফতার, পুলিশি অত্যাচার এবং ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের হামলার প্রেক্ষিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রছাত্রীরা সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলনে নামে।

এই আন্দোলনের নাম প্রথম দিকে কোটা বিরোধী হলেও পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। সরকারের আচরণের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে দেশের সাধারণ জনগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সদস্যরাও যোগ দেন। সারা দেশে বিশেষ করে রাজধানীর রাজপথ ছাত্রছাত্রীদের পুরো দখলে এলে    সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন যে তিনি তার তিন বাহিনী  জনগণের সাথে থাকবেন। এতে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর অধিকাংশ সাংসদ, দলের নেতারা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক চিহ্নিত ব্যক্তিরা গা ঢাকা দেন অথবা পার্শবর্তী দেশে পলায়ন করে। বিজয়ী ছাত্র জনতার উদ্যোগে নোবেল বিজয়ী . ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং বিজয়ের তিনদিনের মাথায় সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম পরীক্ষা: আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা

ক্ষমতা গ্রহণের পর এই নতুন সরকারের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা স্থিত করা। জুলাই পাঁচ তারিখে ছাত্র জনগণের বিজয় অর্জিত হওয়ার পর বস্তুত তিন দিন  দেশে কোনো সরকার ছিল না। বিগত সরকার কর্তৃক দেশের পুলিশ বিভাগকে দলীয় স্বার্থে গুম, খুন, রাহাজানি, ও বিরোধীদের দমনপীড়নে ব্যবহার করাতে পুলিশের উপর আপামর জনসাধারণের ক্ষোভ চরমে উঠে ছিল। এ কারণে জনরোষ এড়াতে ভয়ে পুলিশের সদস্যরাও গা ঢাকা দেয়। ফলে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম কয়েকদিন দেশে কোনো পুলিশ ছিল না।

প্রথম এক মাস: প্রাথমিক সাফল্য ও শহীদি মার্চ

ইতোমধ্যে সরকার এই সমস্যাটির অনেকাংশে সমাধান করতে পেরেছে। এ মাসের পাঁচ তারিখে নতুন সরকারের এক মাস অতিক্রান্ত হয়েছে।  কিছু কিছু জটিল ক্ষেত্রে সমাধান না এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকার প্রাথমিক জরুরি কাজগুলোতে সাফল্য পেয়েছে এবং ইতোমধ্যে দেশ স্বাভাবিক হতেও শুরু করেছে। সরকারের প্রাথমিক সাফল্যের এক মাসকে এবং আওয়ামী সরকারের পতনের প্রথম মাসকে স্মরণীয় রাখার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা আন্দোলনে শহীদ ছাত্রছাত্রদের স্মরণে গত পাঁচই সেপ্টেম্বর তারিখে  শহীদি মার্চ উৎযাপন করেছে।

আন্দোলনের ক্রমবিকাশ: কোটা থেকে বৈষম্যবিরোধী সংগ্রাম

বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন মূলত কোটাপ্রথার বিরুদ্ধে শুরু হয় ১৯৯০-এর দশক থেকে যেটি পরবর্তীকালে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোনলে রূপান্তরিত হয়।   ২০১৮ সালে এই আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন তা জাতীয় দৈনিক, সামাজিক গণমাধ্যম ও বেসরকারি টেলিভিশনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ছাত্ররা মূলত দাবি করে যে, কোটাকে যুক্তিসঙ্গত ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত। এ আন্দোলনের ফলস্বরূপ, সরকার কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও গড়িমসি করতে থাকে এবং বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার বলে ঘোষণা করে। ১৯১৮ সালের কোটা প্রথা উচ্ছেদের নির্বাহী আদেশটি সুপ্রীম কোর্ট বাতিল করলে ছাত্রদের আন্দোলন উত্তাল রূপ ধারণ করে। ফলে সরকার পূর্বের আদেশটি বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করলে নানান ঘটনা দুর্ঘটনার পর আপিল বিভাগ কোটাপ্রথার মার্জিত একটি আদেশ দেয়। সরকারের গড়িমসির কারণে ইতোমধ্যে আন্দোলনে আরো অনেক দাবি যোগ হয় এবং সারা দেশে আন্দোলনটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। জুলাই মাসের পাঁচ তারিখে সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা পার্শবর্তী দেশে পলায়ন করে।

ছাত্র ছাত্রীদের এই আন্দোলনে সাধারণ জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সদস্যরাও যোগ দেয়। ছাত্র জনতার এই বিজয়টি   জুলাই ৩৬ বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ফেসবুকসহ সকল গণমাধ্মে বহুল প্রচার লাভ করে। 

বিজয়ের পর নতুন বাস্তবতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ

তবে, বিজয়ের পরে কিছু কিছু স্বার্থান্নেষী ব্যাক্তি ও গোষ্ঠীর কারণে কোথাও কোথাও সহিংসতা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং দেশের অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। এ ধরণের নেতিবাচক পরিস্থিতির জন্য বিজিত আওয়ামী লীগের গোপন কার্যক্রমকে দায়ী করা হচ্ছে। নোবেল জয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে বিগত সরকারের অপকর্মগুলোর তদন্ত শুরু করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন লোক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহ গুম, খুন ও রাহাজানির  সাথে সম্পৃক্ত কিছু কিছু লোককে ইতোমধ্যে আইনের হেফাজতে আনা হয়েছে। 

 

রাজনৈতিক সংলাপ, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রগতি

 

ইতোমধ্যে ড. ইউনুস দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে সংলাপের আয়োজন করেন এবং আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য একটি তারিখ নির্ধারণে দলগুলোর নেতাদের সাথে মত বিনিময় করেন।  এ ধরণের সংলাপ সরকারের বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করায়ও  ভূমিকা রাখবে।  ইতোমধ্যে শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়নের কথাও জানিয়েছেন। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে উপাচার্য নিয়োগের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দেশের পুলিশ প্রশাসনেও শৃঙ্খলা আনয়ন করার ব্যাপারটিতেও  অগ্রগতি আনতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের বিচারালয়গুলোতে নতুন বিচারক নিয়োগ দিয়ে বিচার ব্যাবস্থাকে পূর্ণোদ্যমে চালু করা হয়েছে। পরিপূর্ণভাবে না হলেও দেশের আইনি কাঠামো  সক্রিয় হয়েছে। এতো অল্প সময়ে এ ধরণের অগ্রগতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাফল্যকে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃত করতে  সক্ষম হয়েছে।

 

আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাবলি

 

বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে কিছু কিছু ঘটনাকে অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন একটি সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনার আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের পরোক্ষভাবে রাজাকার বলে গালি দেয়া,  রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সায়েদের ও ঢাকার আজমপুরে পানি বিতরণকারী মুগ্ধর হত্যা, আন্দোলনে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের রাস্তায় নামা, ইত্যাদি। এ আন্দোলনটি সফল হওয়ার পেছেনে আরো বড় যে কারণটি রয়েছে তা হলো হাসিনা সরকারের সময়ে জন দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া, নিত্য পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, জনগণের সাথে পুলিশের অত্যাচার ও দুর্ব্যবহার অসহনীয় পর্যায়ে বেড়ে যাওয়া, আদালতে ফরমায়েশি রায় দেয়া, অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ম বহির্ভুতভাবে দলীয় লোকদেরকে বসিয়ে দেয়া, ইত্যাদি। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায় যে এই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আতশতর বেশি ছাত্র জনতা শহীদ হয়েছেন। এছাড়া অগণিত ছাত্রজনতা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসারত আছেন। উল্লেখ, বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে বাতিক্রমীভাবে মাদ্রাসার ছাত্ররাও অংশগ্রহণ করে। 

জনঅসন্তোষের বিস্তার ও আন্দোলনের সাফল্যের কারণ

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে শুধু কোটা সংস্কারের দাবি নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বহুমাত্রিক জনঅসন্তোষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে কয়েকটি ঘটনা অনুঘটকের কাজ করে, যার মধ্যে ছিল একটি সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে রাজাকার আখ্যা দেওয়া, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ এবং ঢাকার আজমপুরে পানি বিতরণকারী মুগ্ধর নিহত হওয়ার ঘটনা, এবং প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে জনদুর্ভোগের বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ জনমনে ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আট শতাধিক মানুষ নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই আন্দোলনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে, যা শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে একটি সর্বস্তরের গণআন্দোলনে রূপ দিতে সহায়তা করে।

ছাত্রনেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও নতুন রাজনৈতিক দর্শন

এই আন্দোলনের আরো বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট ছিল এই যে, আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়নি। কিছু দেশপ্রেমিক বিজ্ঞ-ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বে আন্দোলনটি পর্যায়ক্রমিক কিছু থীম  নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিলো। বিজয়ের দিনে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আন্দোলনে নিজেদেরকে আন্দোলনের অংশী হিসেবে শিকার করলেও আন্দোলনকে নিজেরদের নেতৃত্বের ক্রেডিট না দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ছাত্রছাত্রীদেরকেই দিয়েছে। বিজয়ের মুহূর্তে আন্দোলনপরবর্তী সময়কালে পুরাতন ধাঁচে দেশ পরিচালনা করতে অস্বীকার করে ছাত্ররা নতুন ধাঁচের বৈষম্যবিরোধী চেতনায় বিশ্বাসীদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইনুসের নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে দুজন ছাত্র নেতাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। শুধু কি তাই? নেতৃত্ব প্রদানকারী ছাত্রচারীদের মতে, শুধুমাত্র সরকারে তাদের প্রতিনিধি থাকলেই চলবে না, সরকারের ভুল ক্রিয়া-কলাপের বিরোধিতা করতে ছাত্র ছাত্রীদেরকে মাঠেও থাকতে হবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের ক্রীড়া সেক্টরের উন্নতিকল্পে যোগ্য খেলোয়াড়দের বাছাই করার কাজে ছাত্র ছাত্রীদেরকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি যে, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজ হতে বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার দূরীভূত করতে এই দেশপ্রেমিক ছাত্র ছাত্রীরা দেশের সকল উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। 

সংস্কারে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা

তবে একটি কথা এখানে না বললে ই নয়। তা হলো কোনো বিশেষ সেক্টরের পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে। তা না হলে বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কুশীলবরা সরব হয়ে আন্দোলনের অভীষ্ট লক্ষ্য হতে দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত নেতৃত্বকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেতে পারে। 

স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবতা

এ কথাটাও ঠিক যে বর্তমানকার ছাত্র জনতার নিয়োগকৃত অন্তর্বর্তীকালীন - তথা বিপ্লবী সরকার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সংস্কার করতে গেলে দু চার বছরে সম্ভব হবে। স্বল্প সময়ে সকল সেক্টরে বাস্তব ও সঠিক পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। রাষ্ট্র-সরকার সংস্কারের দুটি স্তর রয়েছে; স্বল্পকালীন ও দীর্ঘকালীন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে অধুনা বিভিন্ন মহল হতে দেশের প্রচলিত সংবিধান সরিয়ে নতুন দেশের জন্য নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের দাবি উঠেছে। আমার মতে, এই সরকারের পক্ষে এটা খুব কঠিন হবে। কারণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে নতুন সংসদের প্রয়োজন হবে। তবে স্বল্প মেয়াদে দেশের প্রেসিডেন্টর অফিসে হতে অর্ডিন্যান্স জারি ও সুপ্রীম কোর্টের রুল জারির মাধ্যমে বিপ্লবের উদ্দেশ্য বিবেচনায় বর্তমানকার প্রচলিত সংবিধানের কিছু কিছু প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার উদ্যোগ এই সরকার গ্রহণ করতে পারে।

সংবিধান, নির্বাচন কমিশন ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের দাবি

দেশের জাতীয় সংগীত প্রণয়ন ও পরিবর্তিত সংবিধানের আলোকে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন এখন বৈষম্য বিরোধী চেতনার দাবি হয়ে উঠেছে। দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, বিগত সরকারে সহায়তাকারী দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাবসায়ী, ব্যাংকার ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়াসে চৌকষ, দেশপ্রেমী ও দক্ষ সদস্যদের সমন্বয়ে ৱ্যাবকে পুনর্গঠন করার দাবিটিও এখন মুখ হয়ে গণমাধ্যমে সরব হয়েছে।

প্রশাসনে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের অপরিহার্যতা

বিগত সরকারের একটি স্বৈরাচারী  নীতি ছিল-  অফিস আদালত, পুলিশ, সামরিক  বাহিনী হতে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদসমূহে আওয়ামী ঘরানার অযোগ্য লোকদের বসিয়ে দেয়া। আমরা আশা করবো, এই সকল দলান্ধ লোকদের সরিয়ে যোগ্য ও সৎ লোকদের ওই সকল উচ্চ পদে পদায়ন করার ব্যবস্থা এই বিপ্লবী সরকার করবে । বিশেষ করে মন্ত্রণালয়সমূহ এখনো পূর্বের দলীয় সচিবদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের আওয়ামী দোসর সচিবদের যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে দিতে হবে।

অর্থনীতি, দুর্নীতি দমন ও কৃষিখাতের অগ্রাধিকার

তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির লাগাম ধরতে স্বল্পকালীন কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া বর্থমান বিপ্লবী সরকারের প্রধানতম দায়িত্বের অন্তর্গত। সাথে সাথে দেশের গার্মেন্ট সেক্টরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অর্জিত অর্থসমূহ যথাযথ আর্থিক ব্যাবস্থার মাদ্ধমে দেশে আনাসহ তাদের  স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলোতে এই সরকার মনোযোগী হতে পারে। দেশের বাইরে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে ওই অর্থগুলো দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা যাবে।  আর একটি নীতির প্রতি এই সরকারকে অবশ্যই দৃষ্টি রাখতে হবে, তা হলো আঠারো কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দেয়া কৃষি সেক্টরে ভূর্তকির পরিমান বাড়িয়ে দিয়ে কৃষি সেক্টরের উৎপাদনকে টেকসই ও রপ্তানিমুখী করা গেলে কৃষি সেক্টর অন্নান্ন সেক্টর উন্নয়নে অবদান রাখবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞদের ধারণা ।

উপসংহার: সংস্কার, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের প্রত্যাশা

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান স্বল্পমেয়াদি দায়িত্ব। একই সঙ্গে দেশের গার্মেন্টস খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের উপার্জিত অর্থ বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আনার সুযোগ বৃদ্ধি এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করাও জরুরি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে তা জাতীয় উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, আঠারো কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কৃষিতে ভর্তুকি, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ ও রপ্তানিমুখীকরণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা গেলে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করবে।

সবশেষে বলা যায়, জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন ঘটায়নি; এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং সুশাসনের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাকেও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই আন্দোলনের আত্মত্যাগ একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


প্রবন্ধটি আমার লিংকডইন আইডিতেও আপলোড করা হয়েছে

 

 

No comments

Powered by Blogger.