Header Ads

Header ADS

ভোট, প্রার্থী-চরিত্র ও রাষ্ট্রভবিষ্যৎ

 

ভোট, প্রার্থী-চরিত্র ও রাষ্ট্রভবিষ্যৎ

অধ্যাপক ড. মো. জাফর উল্লাহ 

সাবেক ডিন, কৃষি অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ


(৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে লিখিত)


নির্বাচনের মুহূর্তে নৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন

ভোটের সময়, ইতিহাস নীরবে কিন্তু স্পষ্টভাবে একটি প্রশ্ন তোলে—প্রার্থীর চরিত্র কি রাষ্ট্রকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে, নাকি বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে? ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত হবে, তাদের নৈতিকতা এবং দায়বদ্ধতা সমগ্র দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতায় নেতৃত্বের ভূমিকা

ইতিহাস সব সময় উচ্চস্বরে কথা বলে না; সে নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে শিক্ষা দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো যত শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে ভোগেন, তবে সেই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকে না। নির্বাচনের এই মুহূর্তে এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হযরত উমর (রা.): নৈতিক শাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত

নৈতিক শাসনের প্রসঙ্গে ইতিহাসে বারবার যে নামটি উদাহরণ হিসেবে আসে, তা হলো হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। তাঁর শাসনকাল কোনো আবেগী স্মৃতিচারণ নয়; বরং ন্যায়, সততা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত মর্যাদা বা সুবিধার উৎস হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল দায়িত্ব, প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য নিজের বিবেক এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতার অঙ্গীকার।

ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বের মূল্য

তিনি অন্যদের ওপর শাসন আরোপ করার আগে নিজেকে কঠোর আত্মসংযমের মধ্যে রাখতেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে সতর্কতা, ব্যক্তিগত জীবনে সরলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়পরায়ণতা তাঁর শাসনকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। এসব গুণ কোনো নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং নেতৃত্বের সার্বজনীন নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে সদাসর্বদা বিরাজমান থাকে।

সৎ নেতৃত্বের সুফল, অনৈতিক নেতৃত্বের পরিণতি

ইতিহাস প্রমাণ দেয়, যখন নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা সৎ, দায়িত্বশীল ও সংযমী ছিলেন, তখন সমাজে স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি বিকাশ এবং নাগরিক আস্থা বেড়েছে। বিপরীতভাবে, যখন নেতৃত্বে লোভ, মিথ্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রবেশ করেছে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, সামাজিক বন্ধন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও আস্থার সংকট

ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ভেঙে দেয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যখন জবাবদিহির বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নেন, তখন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়, ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থা ক্ষয় হয়।

ভোট: দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের পরীক্ষা

এই বাস্তবতায় নির্বাচন একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি এমন একটি সময়, যখন নাগরিকদের সিদ্ধান্ত শুধু তাৎক্ষণিক সুবিধা বা আবেগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বরং দেখতে হয়, কে ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে বোঝে, কে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে আমানত মনে করে এবং কে জানে যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।

যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের অপরিহার্যতা

সমাজে সমস্যার মূল কারণ প্রায়ই প্রতিভার অভাব নয়; সমস্যা তৈরি হয় বারবার অযোগ্য, অনৈতিক বা দায়িত্বহীন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে বসানোর মাধ্যমে। ভালো শাসনের জন্য নিখুঁত মানুষ প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন এমন নেতা, যারা বোঝেন—ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা অবিচ্ছেদ্য।

ইতিহাসের আদালতে ভোটারের জবাবদিহি

ইতিহাসের বিচার নিরপেক্ষ। এটি আমাদের কাছে জানতে চায় না আমরা কোন পক্ষের সমর্থক ছিলাম। ইতিহাসের একমাত্র প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা কি বিবেক ও বুদ্ধির আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি নির্ধারণ করে।

আজকের ভোট, আগামীর রাষ্ট্র

সুতরাং, সৎ নেতৃত্ব ইতিহাসে একেকটি পিলার হয়ে অমর থাকে। ভোটের মুহূর্ত সেই সুযোগ, যেখানে সমাজ সিদ্ধান্ত নেয়—সে পিলার শক্ত হবে, না ফাঁপা।


No comments

Powered by Blogger.